Sunday, 12 July, 2020 খ্রীষ্টাব্দ | ২৮ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |

আজ ভয়াল মাগুরছড়া দিবস

মোঃ মোস্তাফিজুর রহমানঃ

আজ কমলগঞ্জ তথা মৌলভীবাজারবাসীর জন্য এক ভয়াল দিন। ১৪জুন মাগুরছড়া ট্র্যাজেডি দিবস।  এক এক করে ২৩টি বছর কেটে গেলেও আদায় হয়নি কোনো ক্ষতিপূরণ।

১৯৯৭ সালে ১৪ জুন মধ্যরাতে মাগুরছড়ার ১নং অনুসন্ধান ক‚প খননকালে হঠাৎ করে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকা। শব্দে ঘুম ভাঙে এলাকার মানুষের। সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে মানুষ বের হয়ে দেখে রাত হলেও দিনের মতো আলোকিত। জানতে পারেন মাগুরছড়া গ্যাস ক‚পে আগুন লেগেছে। সে সময় পুরো এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে গ্যাস।

বিস্ফোরণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সংরক্ষিত বনাঞ্চল, বন ও পরিবেশের জীববৈচিত্র্য, আখাউড়া-সিলেট রেলপথ, ফুলবাড়ী চা-বাগান, কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল প্রধান সড়ক, মাগুরছড়া খাসিয়াপুঞ্জির বাড়িঘর, পানজুম এলাকা ও পিডিবির ৩৩ হাজার কেভি প্রধান বিদ্যুৎ লাইন।

পরোক্ষভাবে ২৮টি চা-বাগানের ক্ষতিসাধিত হয়েছিল। দীর্ঘ ৬ মাস বন্ধ ছিল কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল সড়ক ও আখাউড়া-সিলেট সরাসরি রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা। শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ ১৫ কিলোমিটার (৩৩ হাজার কেভি) উচ্চতাপ বৈদ্যুতিক লাইন পুড়ে নষ্ট হয়। কুলাউড়া, বড়লেখা ও কমলগঞ্জ উপজেলার ৫০টি চা-বাগানে স্থায়ীভাবে বিদ্যুৎ সংকট দেখা দেয়। ৬৯৫ হেক্টর বনাঞ্চলের বৃক্ষ সম্পদ, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়।

পেট্টোবাংলার তথ্যমতে বিস্ফোরণে ২০০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পুড়ে নষ্ট হয়, যার বাজারমূল্য ৫০ কোটি ডলার। লাউয়াছড়া রিজার্ভ ফরেস্টের ৮৭ দশমিক ৫০ একর এলাকার বনাঞ্চল গ্যাসের আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ২০ দশমিক ৫০ একর এলাকা।

পুড়ে যাওয়া গ্যাস, ক্ষতিগ্রস্ত বন ও পরিবেশের বিশাল ক্ষয়ক্ষতি প্রদানে মার্কিন কোম্পানিগুলো টালবাহানা শুরু করে। মাগুরছড়া গ্যাসক‚প বিস্ফোরণের ২১ বছরে ৩টি কোম্পানির হাতবদল হয়েছে। কিন্তু ক্ষতিপূরণ আদায়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। যৎসামান্য ক্ষতিপূরণ স্থানীয় পুঞ্জি ও চা-বাগানের জন্য এলেও অভিযোগ রয়েছে তা বণ্টনে অনিয়মের।

মাগুরছড়া ট্যাজেডির তদন্ত রিপোর্টে বেরিয়ে আসে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি অক্সিডেন্টালের খামখেয়ালিপনা, দায়িত্বহীনতা, অবহেলা ও ত্রুটির কথা। মাগুরছড়ার গ্যাসসম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায়ে জাতীয় কমিটির সভাপতি জায়েদুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আমিরুজ্জামান জানান, মাগুরছড়া গ্যাস ফিল্ডে ভয়াবহ এ বিস্ফোরণে মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। গ্যাস ক্ষেত্রে বিস্ফোরণের পর দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের জন্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজস¤পদ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তাকে প্রধান করে গঠিত তদন্ত কমিটি ১৯৯৭ সালেই মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিবের কাছে দুটি ভলিউমে প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠার তদন্ত রিপোর্ট জমা দেন। পরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এ বিস্ফোরণের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, ক্ষতিপূরণ পাওয়া ও তা বিতরণের বিষয়ে ৩ সদস্যের একটি সাব-কমিটি গঠন করে।

তদন্ত কমিটি সাব-কমিটিকে জানায়, পরিকল্পনা অনুযায়ী দায়িত্ব পালনে অক্সিডেন্টালের ব্যর্থতার জন্যই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। কমিটির তদন্তে অক্সিডেন্টালের কাজে ১৫-১৬টি ত্রুটি ধরা পড়ে। অক্সিডেন্টালের কর্মকর্তারা ২-৩টি ত্রুটির বিষয়ে আপত্তি জানালেও বাকিগুলো স্বীকার করে তদন্ত রিপোর্টে সই করে। কিন্তু গ্যাস ফিল্ডে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ক্ষয়ক্ষতি পরিশোধ না করেই কোম্পানিটি আরেক মার্কিন কোম্পানি ইউনিকলের কাছে বিক্রি করে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে বাংলাদেশ ত্যাগ করে। ইউনিকলও কিছুদিন কাজ করার পর ফের আরেক মার্কিন কোম্পানি শেভরনের কাছে বিক্রি করে তাদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে চলে যায়।

মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায়ে জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আমিরুজ্জামান জানান, ক্ষয়ক্ষতির তদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে- মাগুরছড়া গ্যাস ক্ষেত্রে ছোট-বড় ৩৯টি চা-বাগানের ক্ষতি হয়েছে। এতে ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয় ৪৬ কোটি ৬ লাখ ৮৪ হাজার ৮৩০ টাকা। এ ছাড়া বনাঞ্চলের মোট ক্ষতি ধরা হয়েছে ৯ হাজার ৮৫৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা, ২ হাজার ফুট রেলওয়ে ট্র্যাক ধ্বংস বাবদ ক্ষতি ৮১ লাখ ৫৪ হাজার ৩৯৫ টাকা, সড়কপথ বাবদ ২১ কোটি টাকা, গ্যাসপাইপ লাইন বাবদ ১৩ লাখ টাকা, বিদ্যুৎ লাইন বাবদ ১ কোটি ৩৫ লাখ ৯ হাজার ১৮৬ টাকা, খাসিয়া পানপুঞ্জির অধিবাসীদের পানের বরজ বাবদ ধরা হয়েছে ১৮ লাখ টাকা, বাস মালিকদের রাজস্ব ক্ষতি ধরা হয়েছে ১২ লাখ টাকা। আর বিস্ফোরণে পুড়ে যাওয়া ভূগর্ভস্থ গ্যাসের পরিমাণ ৪৮৫.৮৬ বিসিএফ এবং এর মধ্যে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ ২৪৫.৮৬ বিসিএফ ধরা হয়। উত্তোলনযোগ্য ২৪৫.৮৬ বিসিএফ গ্যাসের দাম ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮৩৪ দশমিক ৪৮ কোটি টাকা।

পরিবেশবাদী সংগঠন এর নেতা মোনায়েম খান বলেন, মাগুরছড়ার ক্ষতিপুরণ আদায়ের আন্তোলন অব্যাহত থাকবে। সরকারের কাছে দাবী জানাচ্ছি ছাতকছড়ার গ্যাসের ক্ষতিপুরণ আদায় হলে মাগুরছড়া কেন আদায় করার উদ্যোগ নিতে।

তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী, ভয়াবহ এই বিস্ফোরণে মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা ধরা হলেও মাগুরছড়া ট্র্যাজেডির এতগুলো বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও ওই মার্কিন কোম্পানির কাছ থেকে আজো মেলেনি ক্ষতিপূরণ।

এদিকে ক্ষতিপূরণের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছে পরিবেশবাদীসহ স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠন। দাবি আদায়ে তারা শান্তিপূর্ণভাবে লং-মার্চ, মানববন্ধন, পদযাত্রা, সভা-সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল, গণসংযোগসহ নানা কর্মসূচি পালন করে। এবারো বিভিন্ন সংগঠন আলোচনা সভা, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালনের প্রস্তুতি নিয়েছে।

Developed by :