Friday, 14 August, 2020 খ্রীষ্টাব্দ | ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |

বন্যা মোকাবিলায় কাজ শুরু করেছে জেলা প্রশাসন

দেশে আবার বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এজন্য বন্যা মোকাবিলায় কাজ শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বন্যাকবলিত জেলাগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। একাধিক জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

তবে এবার আশঙ্কা করা হচ্ছে, ওই ২০-২৪টি জেলার পাশাপাশি আরও ২৩টি জেলা নতুনভাবে বন্যাকবলিত হবে। এগুলো হলো রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, জামালপুর, রাজবাড়ী, শরিয়তপুর, ফরিদপুর, মাদারীপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, চাঁদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর ও নওগাঁ। এসব অঞ্চলের জমির ফসল নষ্ট হওয়া এবং মাছের ঘের জলে ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। সবচেয়ে বেশি আশঙ্কায় রয়েছে কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা পশুর খামারিরা। কোরবানির ২০-২১ দিন বাকি থাকতে যদি পানিতে খামার তলিয়ে যায় তাহলে এসব পশু নিয়ে বিপাকে পড়তে হবে তাদের।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহে অর্থাৎ ১১ জুলাইয়ের পর থেকে উল্লিখিত জেলাগুলোতে বন্যা দেখা দিতে পারে। এসব জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। যদিও এই মূহুর্তে অনেক জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত নদীর পানি বিপদসীমার নিচে রয়েছে। কিন্তু অবিরাম বৃষ্টি হলে নদীর পানি বাড়তে সময় লাগবে না। আর পানি বাড়লেই মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করবে। বাঁধ ভেঙে যাতে বন্যার পানি ফসলি জমি ও লোকালয়ে প্রবেশ করতে না পারে সেই বিষয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়।

এদিকে আবহাওয়া অফিস বলছে, আজ থেকে তিন দিন উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে অবিরাম বৃষ্টিপাত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। স্কুল-কলেজগুলোকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে তৈরি করে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা পেয়েছে জেলা প্রশাসন। মোট কতটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলো এবং কতজন মানুষ আশ্রয় নিয়েছে সেই তালিকা চেয়েছে ত্রাণ মন্ত্রণালয়। যেসব জেলা বন্যাকবলিত হবে বলে আভাস রয়েছে সেইসব স্থানের জেলা প্রশাসন অধিকাংশই সরকারের নির্দেশনা পেয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, আজ ও আগামীকাল থেকে নদ-নদীর পানি আবারও বাড়তে পারে। ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, পদ্মা ও মেঘনা নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে ২০ থেকে ২৪টি জেলা প্লাবিত হবে। এবার বন্যার স্থায়ীত্ব দীর্ঘায়িত হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। সেজন্য আমরা নির্দেশনা দিয়েছি, ডিসি কার্যালয়গুলো যেন বেশিসংখ্যক আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখে। এছাড়া করোনাভাইরাস মহামারি চলছে, এমন পরিস্থিতিতে আশ্রয়কেন্দ্রে সামজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও মাস্ক ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়েছি।’

মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। সরকারি ত্রাণের কোনও ঘাটতি নেই। প্রতিনিয়ত বন্যাকবলিত উপজেলা পরিদর্শন করে স্থানীয় জনগণের মধ্যে সরকারের এই মানবিক সহায়তা বিতরণ করছি আমরা।’

মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক এস এম ফেরদৌসের দাবি, ভৌগলিক কারণে মুন্সীগঞ্জের বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তবে উজানের পানি নেমে যাওয়ার সময় মুন্সীগঞ্জ প্লাবিত হয়। এখন জেলাটির কোথাও বন্যা নেই। তবে সতর্কতা হিসেবে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।

কুড়িগামের জেলা প্রশাসক মোহম্মদ রেজাউল করিম নিশ্চিত করেছেন, এখন কুড়িগ্রামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোর পানি বিপদসীমার নিচে আছে। যদিও অবিরাম বৃষ্টিপাত হওয়ায় বন্যা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। এজন্য সরকারের সব ধরনের সহায়তা নিয়ে তারা প্রস্তুত আছেন। স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় আশ্রয়কেন্দ্র তৈরির কাজ তাদের জন্য অনেকটা সহজ হয়ে গেছে।

গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক আব্দুল মতিনের তথ্যানুযায়ী, জেলার বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল আছে। তবে বৃষ্টিপাত হলে পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। তার কথায়, ‘আমরা সার্বিক বিষয় পর্যবেক্ষণ করছি। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত কাজ করছেন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো তৈরি রাখার নির্দেশনা বাস্তবায়নে কাজ করছি আমরা। দুর্গতদের জন্য পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা আছে। আমরা সেগুলো ঠিকভাবে পৌঁছে দিচ্ছি। এক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিরা জেলা প্রশাসনকে সহায়তা করছেন।’

সরকারের ত্রাণ সহায়তা প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন– নতুনভাবে যে ২৩টি জেলা বন্যাকবলিত হওয়ার আশঙ্কা আছে, সেগুলোর জন্য পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে ২০০ মেট্রিক টন চাল, দুই হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার এবং শিশু খাদ্যের জন্য দুই লাখ টাকা, গো-খাদ্যের জন্য দুই লাখ টাকা ও নগদ তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। পানি বাড়লেও মাঠ প্রশাসন যেন ত্রাণসামগ্রী নিয়ে জনগণের পাশে দাঁড়াতে পারে সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়েছে মন্ত্রণালয়।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী জানান, গবাদি পশু যাতে বন্যার পানিতে তলিয়ে না যায় সেজন্য আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে সেভাবে তৈরি রাখতে বলা হয়েছে। মানুষ যেন পশু-পাখি হাঁস-মুরগি ও কবুতর সঙ্গে নিয়ে আশ্রয় নিতে পারে। এসব পশু-পাখির খাবার কেনার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে পৃথক করে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আগামীতে এই উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।

বন্যাকবলিত এলাকার জনগণকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ডা. এনামুর রহমান। তিনি আশ্বস্ত করেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আপনাদের সবার পাশে আছেন। তিনি সবসময় আপনাদের খবর রাখছেন এবং আমাদের নির্দেশনা দিচ্ছেন। আমাদের কাছে পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ আছে। কাজেই কোনও অবস্থাতেই খাবারের কোনও সংকট হবে না। আপনাদের ক্ষুধার কষ্ট পেতে হবে না।’

Developed by :